দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের বড় একটি অংশ আসে রাজবাড়ী ও ফরিদপুর থেকে। উৎপাদন বাড়াতে চলতি বছর এ দুটি জেলায় ৯ হাজার ২০০ চাষীকে পেঁয়াজ বীজ দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। প্রণোদনার এ বীজে ফরিদপুরে ২০ শতাংশ জমিতে অঙ্কুর গজালেও রাজবাড়ীতে ৯৫ শতাংশই অঙ্কুরোদগম হয়নি। এতে নির্দিষ্ট সময়ে হালি পেঁয়াজ বাজারে আসবে না। কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হবে না বলে আশঙ্কা কৃষকের।
কৃষি বিভাগ বলছে, চাষীদের যে বীজ দেয়া হয়েছে তা বিএডিসি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। কৃষককে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। বীজ না গজালেও উৎপাদনে খুব একটা প্রভাব পড়বে না। এখনো বীজ বপনের সময় আছে। চাষীরা আবারো বীজ সংগ্রহ করে বপন করতে পারবেন।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাঁচ উপজেলায় চার হাজার কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে পেঁয়াজের বীজ বিতরণ করা হয়। বিএডিসির সরবরাহ করা বীজ কৃষকের মাঝে বিতরণ করে কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৮০০, পাংশায় ১ হাজার, কালুখালীতে ৮০০, বালিয়াকান্দিতে ১ হাজার ও গোয়ালন্দ উপজেলায় ৪০০ জন চাষীকে বীজ দেয়া হয়েছে।
সরজমিন বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বারুগ্রামে দেখা গেছে, সরকারিভাবে পাওয়া বীজ সঠিক নিয়মে বপন করা হলেও কারো কারো খেতে একটি বীজও গজায়নি। কৃষক হারান মল্লিক কৃষি বিভাগ থেকে এক কেজি বীজ পেয়েছেন। বপন করার পর তিন সপ্তাহ পার হলেও একটি বীজও গজায়নি। পেঁয়াজ আবাদের জন্য তিনি ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দুই বিঘা জমি লিজ নিয়েছেন। সে জমিও পতিত পড়ে রয়েছে।
একই গ্রামের কৃষক খলিল খান নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বালিয়াকান্দি কৃষি অফিস থেকে বিনামূল্যে পেঁয়াজের বীজ সংগ্রহ করেন। সাধারণত রোপণের এক সপ্তাহের মধ্যে বীজ অঙ্কুরোদ্গম হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর ২০ দিন অতিবাহিত হলেও চারা গজায়নি।
খলিল খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা সরকারি বীজ পেয়েছেন সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এক কেজি বীজ থেকে ভালো চারা জন্ম নিলে ৫০ শতাংশ জমিতে আবাদ করা যায়। এখন বীজ সংকটে অনেক জমিতে পেঁয়াজ রোপণ সম্ভব হচ্ছে না।’
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘বেশির ভাগ বীজই অঙ্কুরোদ্গম হয়নি। এতে কৃষকের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে আমাদের ভয়ে থাকতে হচ্ছে। মাঠে গেলেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তেড়ে আসছেন।’
এদিকে বিএডিসি থেকে সংগ্রহ করা বীজ অঙ্কুরোদ্গম না হওয়ার কারণ জানতে মাঠ পরিদর্শন করেছে কৃষি বিভাগ ও জেলা বীজ প্রত্যয়ন কার্যালয়। এ বিষয়ে জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা মো. মাছিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৩০-৩৫টি স্থানে দেখেছি, তাতে বারি-৪ শতকরা ৩-৪ শতাংশ গজিয়েছে যা খুবই হতাশাজনক। আবার তাহেরপুরি ৪-৫ শতাংশ গজিয়েছে। এটা কারো কাম্য ছিল না। কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে আমরা সুপারিশ করেছি।’
এ বছর রাজবাড়ীতে ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বীজ না গজানোর কারণে নির্দিষ্ট সময়ে হালি পেঁয়াজ বাজারে আসবে না। অন্তত আরো এক মাস উৎপাদন পেছাবে বলে মনে করেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম।
সার্বিক বিষয়ে বিএডিসি রাজবাড়ীর উপপরিচালক সৈয়দ কামরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বীজের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে। তবে এতে উৎপাদন ব্যাহত হবে না। বীজতলা নষ্ট হয়েছে, খেত তো নষ্ট হয়নি। কৃষক অন্য জেলা থেকে বীজ কিনে আবার বপন করতে পারবেন।’
পেঁয়াজ উৎপাদনের দিক থেকে ফরিদপুর বাংলাদেশে দ্বিতীয়। বছরে প্রায় ছয় লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। চলতি বছর রবি মৌসুমে ৫ হাজার ২০০ কৃষকের মাঝে তাহেরপুরী, বারি-৪ ও বারি-৬ জাতের পেয়াঁজ বীজ বিতরণ করেছে বিএডিসি। এক কেজি বীজের সঙ্গে ২০ কেজি সারও দেয়া হয়। এর মধ্যে তাহেরপুরী জাতের ৪ হাজার ও বারি জাতের ১ হাজার ২০০ কেজি বিতরণ করা হয়েছে। কৃষক বলছেন, প্রণোদনা পাওয়া বীজের কোথাও কোথাও শতকরা ৮০ শতাংশ বীজই অঙ্কুরিত হয়নি। অবশ্য কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, শতকরা ২০-৩০ শতাংশ বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছেন। তবে এটি মোটেও সন্তোষজনক নয়।
এ বছর সালথা উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে তাহেরপুরী জাতের ১ কেজি বীজ পেয়েছেন মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কাগদী গ্রামের কৃষক আহসান মোল্যা। দুই বিঘা (১০৫ শতাংশ) জমিতে পেয়াঁজ রোপণের লক্ষ্য ছিল তার। এজন্য আরো এক কেজি বীজ চড়া দামে ক্রয় করেন তিনি। তবে প্রণোদনার বীজ গজানোর হার দেখে হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি।
কৃষক আহসান মোল্যা বলেন, ‘কয়েকদিন পরই হালি পেয়াঁজ রোপণ শুরু হবে। এখন নতুন করে বীজও পাওয়া যাচ্ছে না। বপনের সময়ও প্রায় শেষ। আমি এখন কী করব জানি না। পেয়াঁজ বিক্রি করেই আমার সংসার চলে।’
একইভাবে হতাশা ব্যক্ত করেন নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল গ্রামের কৃষক নজরুল মিয়া। তিনি এক বিঘা জমিতে পেয়াঁজ চাষের লক্ষ্যে বীজ বপন করেন। জমিতে ৫ শতাংশ বীজও অঙ্কুরিত হয়নি।
কৃষকের এমন ক্ষতির দায়ভার নিতে চাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট উপজেলা কমকর্তারা। এজন্য তারা বিএডিসির কর্মকর্তাদের দায়ী করছেন।
নগরকান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তিলোক কুমার ঘোষ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কাজ শুধু বিতরণ করা। বীজ সরবরাহ করেন বিএডিসি (বীজ বিপণন) কর্মকর্তারা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দায়িত্বও তাদের।’
এ বিষয়ে বিএডিসি বীজ (বিপণন) বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দ কামরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে বীজের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়। তাই মাঠ পর্যায়ে কেন এমন হয়েছে, তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। কৃষক যদিও শুধু বিএডিসিরি বীজের ওপর নির্ভর করেন না, ফরিদপুরে অতিরিক্ত বীজ উৎপাদন হয়। তাই মাঠ পর্যায়ে উৎপাদনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম।’